এশিয়া-প্যাসিফিক

প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেয় মাত্র এক-চতুর্থাংশ কোম্পানি

ব্যবসায়িক আলোচনায় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো জলবায়ুসংক্রান্ত বিষয়াদি জনপ্রিয় শব্দবন্ধে পরিণত হয়েছে।

ব্যবসায়িক আলোচনায় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মতো জলবায়ুসংক্রান্ত বিষয়াদি জনপ্রিয় শব্দবন্ধে পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে সামগ্রিকভাবে প্রকৃতিসংক্রান্ত বিষয় কোম্পানি পর্যায়ে মনোযোগ কাড়লেও জনপরিসরে ততটা চর্চিত নয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কোম্পানিগুলো প্রকৃতিসংক্রান্ত বিষয় প্রতিবেদনে যুক্ত করলেও তা অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় কম। এতে প্রকৃতির ওপর এসব ব্যবসার প্রভাব বা সম্ভাব্য সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। খবর দ্য স্ট্রেইট টাইমস।

চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দিয়েছে গ্লোবাল লাক্সারি গ্রুপ কেরিং ও এনইউএস বিজনেস স্কুলের সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগ।

যেখানে বলা হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ শীর্ষ কোম্পানি টেকসই বা বার্ষিক প্রতিবেদনে পানি, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে শুধু ২৫ শতাংশই বিষয়গুলোকে ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনায় নিয়েছে।

গবেষণায় এ অঞ্চলের ১৪টি বাজার ও ১১টি শিল্প খাতের প্রায় ৭০০ তালিকাভুক্ত কোম্পানির দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ কোম্পানি নিজেদের প্রতিবেদনে প্রকৃতিসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছে।

কিছু ক্ষেত্র ঐতিহ্যগতভাবে প্রকৃতিসম্পর্কিত কোম্পানির তথ্য প্রকাশের পরিমাণ বেশি। যেমন কৃষি বা বনায়ন, কারণ তাদের কার্যক্রম ও ফলাফলের জন্য সরাসরি প্রকৃতির ঝুঁকি সম্পর্কে চিন্তা করতে হয়। আবার প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং তাদের সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে প্রকৃতির পরোক্ষ প্রভাব বুঝতে শুরু করেছে। কেননা গুদাম বা ডাটা সেন্টারের মতো অবকাঠামোয় প্রকৃতির প্রভাব রয়েছে।

মোট কোম্পানির এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ কোম্পানি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রকৃতিসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে। তারা কোম্পানির কার্যক্রম, মূল্য তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে প্রকৃতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

প্রকৃতিসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশকারী কোম্পানির মধ্যে অস্ট্রেলিয়া শীর্ষে রয়েছে। দেশটির ৬৮ শতাংশ কোম্পানি প্রকৃতিকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাবশালী উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছে। এরপর ৪৮ শতাংশ নিয়ে তালিকায় রয়েছে নিউজিল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া উভয়ই ৪২ শতাংশ। ১৮ শতাংশ নিয়ে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে দক্ষিণ কোরিয়া।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সিঙ্গাপুরের কোম্পানির মধ্যে ১৪ শতাংশ প্রকৃতিসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে, যা টাস্কফোর্স অন নেচার-রিলেটেড ফাইন্যান্সিয়াল ডিসক্লোজার্স বা টিএনএফডির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

টিএনএফডি হলো একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকৃতিসম্পর্কিত ঝুঁকি এবং সুযোগ চিহ্নিত, পরিমাপ ও প্রকাশ সহজ করা এর লক্ষ্য। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, জলবায়ুসংক্রান্ত প্রকাশনার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর অনেক ভালো করেছে। কারণ ৯৮ শতাংশ কোম্পানি টিএনএফডির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এখান থেকে প্রকৃতি ও জলবায়ুসংক্রান্ত উদ্যোগ এবং দায়িত্বের পার্থক্য বোঝা যায়। ন্যাংইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক কেলভিন লোর মতে, জলবায়ু প্রকাশনার তুলনায় বিস্তৃত প্রকৃতি প্রকাশনা। তার মতে, জলবায়ুসম্পর্কিত প্রতিবেদনগুলো মূলত গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ পরিমাপ করে, যা তুলনা করা সহজ। কিন্তু প্রকৃতিসম্পর্কিত প্রতিবেদন অনেক বিস্তৃত। কারণ এটি জীববৈচিত্র্য, মাটির গুণমান, পানি বা বন উজাড় ইত্যাদির মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের ওপর মনোযোগ দেয়, যা অনেকটা সম্পূর্ণ মেডিকেল চেকআপের মতো, যেখানে রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দনের মতো বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।

এছাড়া ৭৫ শতাংশ কোম্পানি তাদের ব্যবসায়িক কৌশল প্রণয়নে প্রকৃতিসম্পর্কিত সমস্যা ও এর প্রভাব স্বীকার করেছে এবং ৪৯ শতাংশ আর্থিক পরিকল্পনায় এর প্রভাব চিহ্নিত করেছে। তবে মাত্র ২৫ শতাংশ কোম্পানি প্রকৃতিসম্পর্কিত বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখার পরিকল্পনা করেছে। আরো কম কোম্পানি ৯ শতাংশ মূলধন প্রবাহ ও অর্থায়ন সুযোগের কথা উল্লেখ করেছে। এর অর্থ হলো প্রকৃতিসম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে আরো বেশি বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে।

ঝুঁকি ও প্রভাব ব্যবস্থাপনা স্তরের মধ্যে ৩৯ শতাংশ কোম্পানি তাদের সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মধ্যে প্রকৃতিসম্পর্কিত সমস্যা অন্তর্ভুক্ত করেছে। অবশ্য সিজিএস ও কেরিং বলেছে, এ প্রবণতা বাড়বে। কারণ কোম্পানিগুলো ক্রমে এ চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিকাশের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে।

ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রকৃতিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। এমনকি তাদের ভ্যালু চেইন কার্যক্রমগুলোর স্থান চিহ্নিত করে প্রকৃতিসংক্রান্ত অগ্রাধিকার এলাকাগুলোর তথ্য প্রকাশে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কোম্পানির অংশগ্রহণ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য দেশের কোনো কোম্পানি এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করেনি।

টিএনএফডি মান সংজ্ঞায়িত হয় অগ্রাধিকার এলাকার ভিত্তিতে। অগ্রাধিকার এলাকা হলো এমন স্থান, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে পানি সংকটের ঝুঁকি বেশি বা বাস্তুসংস্থানের দ্রুত অবনতি ঘটছে।

এ ধরনের কার্যক্রমে অংশ নেয়ার প্রয়োজনীয়তায় গুরুত্ব দেন এনইউএস বিজনেস স্কুলের সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির পরিচালক অধ্যাপক লরেন্স লো। তার মতে, প্রকৃতি ও জলবায়ু একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যার তুলনায় প্রকৃতিসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো নতুন ধারণা নিয়ে আসে, যা পরিবেশগত সম্পদ ও বাস্তুসংস্থানের পরিষেবার মতো ধারণা প্রবর্তন করে, এটি কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন হতে পারে।

তবে এ ধরনের তৎপরতায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানান লরেন্স লো। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির প্রভাব পরিমাপ করা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, জীববৈচিত্র্যের প্রভাব পরিমাপে কী গণনা এবং কীভাবে গণনা করতে হবে সে বিষয়ে কোনো ঐকমত্য নেই।’

আরও